সৌদি প্রবাসীদের মধ্যে যে কারনে অস্বাভাবিক মৃত্যু সংখ্যা বাড়ছে…??

দুর্ঘটনাসহ নানা ধরনের অসুস্থতায় সৌদি প্রবাসীদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার বাড়ছে। সর্বশেষ সোমবারও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আল বাহা প্রদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় তিন বাংলাদেশি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এর আগে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা জিজানে সড়ক দুর্ঘটনায় সাত বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, আহত হন আরও ১৩ জন।

সড়ক দুর্ঘটনা ছাড়াও মস্তিষ্কে আকস্মিক রক্তক্ষরণ, হৃদরোগ এবং আত্মহত্যাজনিত কারণে অস্বাভাবিক মৃত্যু বেড়েছে সৌদি প্রবাসীদের মধ্যে।

দেশটিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালে ৪৪১ জন প্রবাসীর লাশ সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে গেছে। এর মধ্যে দাম্মাম থেকে ৯৩ জন, জেদ্দা থেকে ৩২ জন, রিয়াদ থেকে ৩১৬ জন প্রবাসীর লাশ দেশে পাঠানো হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিনা ভাড়ায় প্রবাসী বাংলাদেশির লাশ বহন করেছে।

দীর্ঘদিন সৌদি আরব প্রবাসী রিয়াদের সাফা মক্কা ক্লিনিকের চিকিৎসক শাহেদ আলী বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে প্রচণ্ড গরম। এখানে খাবার খুব সস্তা ও তেলযুক্ত। পাশাপাশি দুশ্চিন্তা, মালিকের অত্যাচার, দেশে স্বজনদের নানা চাহিদা, বিনোদনহীন একঘেয়ে জীবন প্রবাসীদের মানসিক চাপে ফেলে।”

হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ ধূমপান উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “মূলত মানসিক চাপেই অনেকে স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হন। অনেকে আবার দুর্ঘটনায় মারা যান।”

আরেকটি পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত ৫ বছরে সৌদি আরব থেকে দেশে গেছে ৬ হাজার ৫৮০ লাশ। যা প্রবাস থেকে দেশে পাঠানো মৃতদেহের ২৯ শতাংশ।

এছাড়া গত ৪ মাসে মারা যান পাঁচশরও বেশি প্রবাসী। এর মধ্যে রিয়াদে ২২২ জন ও জেদ্দায় ২৭৭ জন। এদের মধ্যে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে ৩২৪ জনের লাশ ও সৌদিতে দাফন করা হয়েছে ১৭৫ জনের। এদের অধিকাংশই অস্বাভাবিক মৃত্যু। এর মধ্যে সড়ক দুঘটনায় মারা যান ৪৭ জন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে ৫৭ জন।

বাংলাদেশ দূতাবাস কার্যালয়ের সূত্রানুসারে, ২০১৭ সালের প্রথম ৬ মাসে ২১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, দুর্ঘটনা, হৃদরোগ, অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে। সবচেয়ে বেশি ৪৪ জন মারা গেছেন স্ট্রোকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু দুর্ঘটনায় ৪২ জন। হৃদরোগে মৃত্যু হয় ৩৬ জনের। স্বাভাবিক মৃত্যু হয় ৫০ জনের।

প্রবাসীদের এমন মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো কোনো অনুসন্ধান হয়নি। প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো মৃত্যুর এ সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন। গত পাঁচ বছরে যত প্রবাসীর লাশ দেশে গিয়েছে তাদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যু আকস্মিক।

রিয়াদের এলিকসার মেডিকেল সেন্টারে দীর্ঘদিন কর্মরত চিকিৎসক আব্দুল হালিম বলেন, “প্রতি ৩ মাস পর পর প্রত্যেক প্রবাসীকে অন্তত একবার ডাক্তারের পরামর্শ ও পরীক্ষা করানো জরুরি।”

প্রবাসী বাংলাদেশি, মৃতদের স্বজন ও দূতাবাস বলছে, বিভিন্ন কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হন। যে বিপুল টাকা খরচ করে তারা বিদেশে যান, সেই টাকা তুলতে অমানুষিক পরিশ্রম, দিনে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সব মিলিয়ে মানসিক চাপে ভোগেন তারা।

সৌদি আরবের আল খোবারে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা খ্যাত ছোবেকায় ইকবাল হোসেন (৩২) ও জেদ্দার বালাদ শহরে প্রবাসী ব্যবসায়ী মো. হেলাল উদ্দীন (৩৫) গলায় দড়ি ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করেন। মাত্র ৮ মাস আগে সংসারের সচ্ছলতার আশায় সৌদি আরব আসা এ প্রবাসী অস্বাভাবিক মানসিক চাপ বা কাজকর্মহীন দিনাতিপাত করতে গিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে ধারণা করা হয়।

অনেক বছর পর দেশে ফেরার কথা ছিল নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আরেক প্রবাসী শাহজাহানের। কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে সঞ্চিত টাকায় দেশেই কিছু করে বাকি জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। গত ৬ মাস আগে তার স্ত্রী মারা যান। বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো তার মেয়ের। কিন্তু আকস্মিক মত্যু তা হতে দিল না। দুটি প্যাকেটে গোছানো সব জিনিসপত্র সেভাবেই আছে, শুধু নেই শাহজাহান। নিথর দেহ পড়ে আছে মাটিতে।

অন্যদিকে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়ীয়া জেলার চড়কগাছী গ্রামের প্রবাসী আলম মাতবরের দ্বিতীয় ছেলে সোহেল মাতবর (২০)। ৪ মাস আগে ৮ লাখ টাকায় নতুন ভিসা কিনে সৌদি আরব এসেছিলেন তিনি।

এক রুমে ৯ জন থাকতেন তারা। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই ঘুমাতে যান। সকালে উঠে তাকে ডাকাডাকি করার পর তার কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে পুলিশে খবর দেন সহকর্মীরা। পুলিশের সঙ্গে আসা চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে সাড়ে ৮ লাখ টাকায় বিদেশ এসে কাজ না পেয়ে ঋণ পরিশোধের চিন্তাভাবনা থেকেই প্রবাসী সোহেল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন বড় ভাই সোহাগ। এত কম বয়সে এমন মৃত্যু তাদের পরিবার মেনে নিতে পারেননি।

দাম্মামে কাজ করার সময় সিঁড়ি থেকে পড়ে মারা যান রঙমিস্ত্রী রফিকুল ইসলাম (৪০) নামে এক বাংলাদেশি। জেদ্দায় কাসেম চৌধুরী (৫০) নামে আরেক ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাসায় মারা যান।

ডিসেম্বরে লাশ হয়ে যাওয়া সাতক্ষীরার গোলাম হোসেন (৩১) জমিজমা বিক্রি করে দুই বছর আগে সৌদি আরব এসে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। স্ট্রোকে তার মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্ত্রী বিলকিস আক্তার। চার বছরের একমাত্র সন্তান নিয়ে তিনি এখন অসহায় জীবনযাপন করছেন।

এত কম বয়সে কীভাবে সে স্ট্রোক করলো কেউ আজও বুঝতে পারছেন না।

সৌদি আরব প্রবাসী রফিকুল ইসলাম (২৯), হারুনুর রশিদ (২৭), গোলাম হোসেন (৩১) ও বাসেদ মিয়া (৩৯) এ চার বাংলাদেশির উদ্দেশ্য ছিল নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করা, চারজনেরই লাশ দেশে গিয়েছেন গত কয়েক মাসে। তাদের মৃত্যুর কারণ বলা হয়েছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক। এত কম বয়সে এমন মৃত্যু তাদের পরিবার মেনে নিতে পারছেন না।

সৌদি আরবের মক্কায় ওমরা করতে এসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও দুই সন্তান হারিয়ে অবশেষে আহত কামরুল ইসলাম মারা যান। আরেকটি সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও দুই সন্তান হারান ইতালি প্রবাসী কামরুল ইসলাম নিলয়।

জানা যায়, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসীদের লাশ দেশে নিতে সহযোগিতা করে। মৃত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে দাফনের জন্য বিমানবন্দরে বোর্ড প্রথমে ৩৫ হাজার টাকা এবং পরে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেয়।

সৌদি আরবের সাধারণ বীমা সংঘের বরাত দিয়ে সৌদি গেজেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের শেষ তিন মাসে কর্মক্ষেত্রে প্রবাসী হতাহতের সংখা ৭৯০৮ জন। এদের মধ্যে নির্মাণ কাজে ৩ হাজার ৬০১ জন, উৎপাদনমুখী কারখানায় ১ হাজার ৫৬১ জন ও বাণিজ্যিক খাতে ১ হাজার ৩৮৭ জন। বীমা, বিনিয়োগ সংস্থা, আবাসন সংস্থা, ব্যবসা সেবা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এ প্রত্যেক ক্ষেত্রে প্রায় ২০০ জন করে হতাহত হয়েছেন।

পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে যারা স্বজন-প্রিয়জন ছেড়ে বাড়তি একটু আয়ের আশাতে নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি দেন অন্য দেশে তারাই প্রবাসী। অনেক কষ্টের উপার্জনের টাকা দেশে পাঠিয়ে তারা হন দেশের রেমিটেন্স যোদ্ধা। যাদের পাঠানো টাকাতে সচল থাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা তারা কি সচল?
-মো. শফি উল্লাহ

Leave a Reply